আপনারা যারা ৩-৬ মাস বা তারও বেশি দিন যাবৎ হাড় ক্ষয় ও মাংসপেশির ব্যথা যেমন হাঁটুর ব্যথা বা অস্টিওআর্থাইটিস, প্লান্টার ফাসাইটিস বা পায়ের গোড়ালি ব্যথা, কাঁধের জয়েন্টে ব্যথা বা ফ্রোজেন সোল্ডার, টেনিস এলবো বা কুনুই ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদি কুচকিতে ব্যথা বা হিপ জয়েন্টে এভাসকুলার নেকরোসিস (এভিএন) এই জাতীয় সমস্যায় ভূগছেন?
বয়স্ক মানুষদের মধ্যে হাটু ব্যথা প্রায় প্রতিটি পরিবারেই দেখতে পাওয়া যায়। এর বিভিন্ন কারনের মধ্যে প্রধান কারন অস্টিও-আর্থাইটিস বা অস্থিসন্ধির ক্ষয়। আমাদের হাঁটুর জয়েন্টে একধরনের নরম এবং মসৃন আবরন বা কার্টিলেজ দিয়ে ঢাকা থাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের বৃদ্ধির ফলে কার্টিলেজে পানির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে প্রোটিনের পরিমাণ কমতে থাকে যার ফলে ক্ষয় হয়ে অমসৃণ আকার ধারন করে তখন জয়েন্ট নড়াচড়ায় ব্যথা অনুভূত হয়, অনেক সময় ফুলে যায়। এটিই অস্টিওআর্থাইটিস বা হাঁটুর এক প্রকার বাত।আমি যদি আরও সহজভাবে বলি, হাঁটুর জয়েন্ট এ যে কুরকুরে বা কচকচ হাড্ডির মত প্রলেপ থাকে সেটা ক্ষয় হয়ে যদি জয়েন্টে থাকা ফ্লুইডের সাথে মিশে যায়, তখন ব্যথা অনুভূত হয় সেটাকেই অস্টিওআর্থাইটিস বা গিটে বাত বলে।
হাঁটুর অস্টিওআর্থাইটিস এর অন্যতম প্রধান কারন বয়সবৃদ্বি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে কার্টিলেজে পানির পরিমান বাড়তে থাকে এবং প্রোটিনের পরিমান কমতে থাকে। সেজন্য তরুনাস্থি বা কার্টিলেজ ক্ষয় হয় ফলে অস্টিওআর্থাইটিস হতে পারে।
হাটু আমাদের শরীরের ওজন বহন করে। ধরুন আপনার শরীরের ওজন যদি ১০০ কেজি হয় এবং আপনার বয়স যদি ৫০ কিংবা ৬০ বছর হয় তাহলে প্রায় ২০-৩০ বছর যাবত হাটু তা বহন করছে। তাই অতিরিক্ত দৈহিক ওজন হাঁটুতে বেশী চাপ সৃষ্টি করে যার ফলে হাঁটুতে ক্ষয় বেশী হয়।
আঘাত বা জয়েন্টে যদি কোন ইনজুরি হয় সেখান থেকেও কার্টিলেজ ক্ষয় হয়ে এমন টি হতে পারে।
হাটুর ভিতরে যে তরল পদার্থ বা সায়নোভিয়াল ফ্লোয়িড কমে গেলে জয়েন্ট নড়াচড়া করতে ঘর্ষন হয় অর্থাৎ জয়েন্টে স্পেস কমে যায় তখনও অস্টিওআর্থাইটিস হতে পারে।
1. হাঁটুতে ব্যথা হবে, হাটু ফুলে যাবে এবং হাঁটুতে হাত রাখলে গরম অনুভূত হবে।
2. হাটু ভাঁজ করতে কষ্ট হবে বা জয়েন্ট জমে আছে এমন বোধ হবে।
1. হাঁটুতে ব্যথা হবে, হাটু ফুলে যাবে এবং হাঁটুতে হাত রাখলে গরম অনুভূত হবে।
3. হাটু গেরে নিচে বসতে সমস্যা হবে এবং সিডি দিয়ে উঠানামা করতে কষ্ট হবে।
4. হাটুর জয়েন্টের আক্রিতি পরিবর্তন হয়ে যাবে এবং কখনও কখনো হাঁটুর ভিতর নড়াচড়ায় কটকট শব্দ করবে।
ফ্রোজেন সোল্ডার বা কাঁধের জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া
কাঁধ বা সোল্ডার জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, কাঁধে তীব্র ব্যথা এবং ধীরে ধীরে কাঁধের ও হাতের নাড়ানোর ক্ষমতা কমে যাওয়া। যার ফলে হাত পিছনে নিতে পারেন না, চুল আচড়াতে সমস্যা, এমনকি আপনি ব্যথার পাশ দিয়ে ঘুমাতেও পারেন না। এটাকে বলে ফ্রোজেন স্লোল্ডার।
সাধারনত ডায়াবেটিক রোগী, স্লোল্ডার ইনজুরি, কাঁধের জয়েন্ট বা টেনডনে এ যদি ক্যালশিয়াম জমা, ঘাড়ের হাড ক্ষয় বা স্পন্ডাইলাইটিস এবং মহিলাদের পিঁড়িয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়।
প্লান্টার ফাসাইটিস বা ক্যালকেনিয়াম স্পার বা গোড়ালি নিচে ব্যথা
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্লোরে পা ফেলতে গেলে প্রথমেই যদি গোড়ালির নীচে তীব্র ব্যথা লাগে তাহলে সম্ভবত আপনার প্লান্টার ফাসাইটিস বা ক্যালকেনিয়াম স্পারের সমস্যায় ভুগছেন। এই ব্যথা হয় আমাদের পায়ের পাতার নিচে স্টং ফ্রাইবাস টিস্যু অর্থাৎ স্ট্রিং বা টানার মতো যে বেন্ড থাকে তাতে যদি ছোট ছোট মাইক্রো ট্রিয়ার হয় তাহলে। এই সমস্যা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, রং ফুটওয়ার বা ছোট বড় জুতা ব্যবহার, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির এবং ফ্লাট ফুটের জন্য হতে পারে। এছাড়াও কখনো কখনো পায়ের গোড়ালিতে ক্যালকেনিয়াম যে হাড় থাকে কোন কারণে যদি হাড়ের বৃদ্ধি হয়ে ছোট হুক বা কাটার মত তৈরি হয় তখনও এমনটি হতে পারে ।
কার্পাল টানেল সিনড্রোম বা সিটিএস
আপনার যদি হাতের কব্জি থেকে তালু এবং আঙ্গুল সহ অবশ হয়ে আসে, ঝিনঝিন করে, আবার ব্যথা হয়ে কখনও কখনও ফুলে যায়, লিখতে ও কম্পিউটারের কিবোর্ড কাজ করতে খুবই সমস্যা হয়। তখন বুজতে হবে আপনার যে সমস্যাটি হচ্ছে তার নাম সিটিএস বা কারপাল টানেল সিনড্রম।
কোন কারনে যদি কারপাল টানেলের উপরে থাকা ফ্লেক্সর রেটিনাকুলামে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশনের ফলে শক্ত হয় তখন টানেলের আয়তন ছোট হয়ে টানেলের মধ্যকার নার্ভটিতে চাপা পরে তখনই এই সমস্যা শুরু হয়।
যারা দীর্ঘক্ষন কম্পিউটারে টাইপিং করে এবং সাংবাদিক দের মধ্যে শর্টহ্যান্ড এ লিখে তাদের বেশী হয়।
এভাসকুলার নেকরোসিস বা এভিএন (AVN)
আপনার বয়স যদি ২৫-৫০ বছরের মধ্যে হয় এবং নিয়মিত হাঁটাচলা করার সময় হিপ জয়েন্ট বা কুচকিতে ব্যথা করে, হাটতে গেলে ব্যথার জন্য খুরিয়ে খুরিয়ে হাঁটেন, দুই পা ক্রস করে বসতে পারেন না, এমনকি অনেক সময় শুয়ে থাকলে ও ব্যথা হয় তাহলে বুঝতে আপনার যে সমস্যাটি হচ্ছে তার নাম- অ্যাভাসকুলার নেকরোসিস অফ হিপ বা এভিএন। কখনো কখনো এটাকে অস্টিওনেক্রোসিসও বলে।
হিপ জয়েন্টে অ্যাভাসকুলার নেকরোসিস বা এভিএন এমন একটি রোগ যা ফিমোরাল হেড বা হিপ জয়েন্ট এ স্হায়ী বা অস্হায়ী ভাবে রক্ত চলাচল বন্ধের ফলে হয়। রক্ত প্রবাহ বন্ধ হলে হাড়ের টিস্যু গুলো অক্সিজেনের অভাবে আস্তে আস্তে মারা যেতে থাকে যার ফলে হাড় দুর্বল এবং ক্ষয় হয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে।
এই রোগের মূল কারন ইডিওপ্যাথিক বা অজানা। এছাড়া যদি কারও হিপ জয়েন্টে আঘাত পাওয়ার ফলে রক্ত সরবরাহ বন্ধ থাকে, দীর্ঘদিন যাবত স্ট্যারোয়েড জাতীয় ঔষধ মুখে বা ইনজেকশনের মাধ্যেমে নেয় বা ব্যথা নাশক ঔষধ কিংবা যদি অ্যালকোহল সেবন করেন দীর্ঘদিন তাহলে এই সমস্যা হতে পারে।
তবে রিসেন্টলী কভিড-১৯ এর পরে এই রোগীর সংখ্যা অনেক বৃদ্বি পেয়েছে। অনেক গবেষনার তথ্য মতে, যারা কভিড হয়েছিলো তাদের অনেকেই উচ্চ মাত্রার স্ট্যারয়েড ইনজেকশন দিতো হয়েছিলো ইন্ট্রাভেনাস কিংবা মুখে প্রচুর স্ট্যারয়েড ঔষধ খেতে হয়েছিলো।
এই রোগ নির্নয় করার জন্য শুরুতে এমআরআই বা বোন স্কেন করা সবচেয়ে ভাল, পরবর্তিতে এক্সরে তে চলে আসে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দেওয়া যায় তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি ঔষধ, ফিজিওথেরাপি যেমন ম্যানুয়াল থেরাপি বা থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, ম্যানিপুলেশন থেরাপি, বিভিন্ন ইলেক্টোথেরাপি যেমন- আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, লেজার থেরাপি, বিভিন্ন ধরনের মালিশ, ক্রাইরোপ্যাকটিক, হিজামা এমনি স্ট্যারোয়েড ইনজেকশন দেওয়ার পরেও আশানুরূপ উপকার পাননি! তাদের জন্য রিজেনারেটিভ থেরাপি অর্থাৎ পিআরপি বা প্লাজমা থেরাপি, ফোকাসড শকওয়েব থেরাপি, ভিসকো সাপ্লিমেন্ট, টেকার রেডিওফ্রিয়োন্সীর পাশাপাশি এডভান্সড আকুপাংচার অত্যন্ত কার্যকরী। যা এফডিএ এপ্রুভড এবং সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত।
এই রিজেনারেটিভ থেরাপির জন্য আমরা কিছু থেরাপিউটিক ডিভাইস ব্যবহার করি। যেমন-ফোকাসড বা রেডিয়াল শকওয়েব থেরাপি মেশিন, টেকার রেডিওফ্রিকোয়েন্সী মেশিন এবং পিআরপি বা প্লাজমা থেরাপির জন্য সেন্টিফিউজার মেশিন। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়ের পরে সঠিক চিকিৎসা নিলে দীর্ঘমেয়াদি হাঁটু ব্যথা বা অস্টিওআর্থাইটিস, পায়ের গোড়ালির ব্যথা বা প্লান্টার ফাসাইটিস সহ সব ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা থেকে সমাধান সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে আক্রান্ত টিস্যুতে রক্তপ্রবাহ বা রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির ফলে শরীরের নিজস্ব পূর্নগঠন পদ্ধতি অর্থাৎ এনজিওজেনেসিস প্রক্রিয়া এবং ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ কে নিয়ন্ত্রণ করে নতুন টিস্যু তৈরি করতে সাহায্য করে যার ফলে সম্পূর্ণ ব্যথা মুক্ত হয়ে সুস্থ হওয়া সম্ভব।
আমাদের এখানে রোগীরা কীভাবে সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং আমরা ঠিক কী ধরনের উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করি, তা এই ভিডিওটি দেখলে আপনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন।
Bachelor of physiotherapy/BPT(DU) Training and Membership- International Society of Medical Shockwave Treatment (ISMST) Auckland, New Zealand. Consultant- Regenerative Therapy Practitioner, ACRTBD.
All rights reserved. | Designed by Wallxer