প্রতি ৫ জন পুরুষের মধ্যে ১ জনের জীবনে কোনো না কোনো সময় ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা লিঙ্গ উত্থান সমস্যা দেখা দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা স্থায়ী কোনো রোগ নয়, বরং সাময়িক একটা জটিলতা যা সঠিক রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসায় পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব।
আজকাল বিশ্বজুড়ে এই সমস্যার চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি আধুনিক রিজেনারেটিভ থেরাপি যেমন পি-শট বা প্লাজমা থেরাপি এবং ফোকাসড শকওয়েব থেরাপি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এসব চিকিৎসা শুরু করার আগে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা জরুরি, কারণ ভুল কারণ ধরে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করলে উপকারের বদলে সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হতে পারে।
মনে রাখবেন: এই সমস্যা নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। এটা একটা মেডিক্যাল কন্ডিশন, ঠিক যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ। যত দ্রুত সঠিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন, তত দ্রুত সমাধান পাবেন।
সুস্থ যৌন সম্পর্কের জন্য পুরুষাঙ্গের যথাযথ উত্থান হওয়া স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। নিচের তিনটি লক্ষণের মধ্যে যদি কমপক্ষে একটি, গত ৩-৪ মাস ধরে প্রায় প্রতিবার সহবাসের সময় ঘটতে থাকে, তাহলে এটাকে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বলা হয়:
যদি নিয়মিত আপনার ইচ্ছার চেয়ে অনেক আগেই বীর্যপাত ঘটে অর্থাৎ সহবাস শুরু করার আগেই বা শুরুর ১-১.৫ মিনিটের মধ্যে বীর্যপাত হয়ে যায়, তাহলে এটাকে প্রিম্যাচিউর ইজাকুলেশন বলা হয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর কারণ মানসিক হলেও, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে পুরুষাঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহ না থাকা এবং নার্ভ অতিরিক্ত সেনসিটিভ হয়ে যাওয়াও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিচের লক্ষণ গুলো থাকলে এটি পেরোনিজ ডিজিজ হতে পারে: উত্থানের সময় পুরুষাঙ্গে ব্যথা হয়, নরম অবস্থায় হাত দিলে দড়ির মতো শক্ত অংশ অনুভূত হয়, উত্থানের সময় পুরুষাঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে যায়, সহবাসের সময় ব্যথা হয়।
স্বাভাবিক পুরুষের ক্ষেত্রে লিঙ্গ উত্থানের সময় পুরুষাঙ্গের ইলাস্টিক টিস্যু বিস্তৃত হয়ে সোজাসুজি উত্থান করে তোলে। যেহেতু স্কার বা প্লাগ টিস্যু ইলাস্টিক বা স্থিতিস্থাপক না বরং শক্ত চুনার মত, সেহেতু লিঙ্গের অন্যান্য অংশ বড় হওয়ার সময় এটা হার্ড বা কঠিন হয়ে যায়, ফলে লিঙ্গ বেঁকে যায়।
পেরোনিজ ডিজিজ বা পুরুষাঙ্গ বাঁকা হয়ে যাওয়া একটি কানেকটিভ টিস্যু ডিসঅর্ডার। এক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গের নরম টিস্যুতে ফাইব্রাস প্লাগের বৃদ্ধি ঘটে অর্থাৎ টিউনিকা অ্যালবিজিনা অংশে ফাইব্রোসিং প্রক্রিয়া ঘটে।
মূলত আঘাত, ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ কিংবা উত্থান অবস্থায় হাত দিয়ে চাপ প্রয়োগের ফলে পেরোনিজ হতে পারে। পেনিসের আল্ট্রাসনোগ্রাফী পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা যায়।
ইরেকশন প্রক্রিয়া আসলে কীভাবে কাজ করে?
পুরুষের উত্তেজনা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার সাথে জড়িত মস্তিষ্ক, হরমোন, আবেগ, নার্ভ, মাংসপেশি এবং রক্তনালী। কোনো যৌন উদ্দীপনা (দেখা, শোনা, স্পর্শ, বা কল্পনা) মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করে। এরপর হরমোন ও নার্ভের সম্মিলিত কাজে রক্তনালী প্রসারিত হয়ে পুরুষাঙ্গে রক্ত প্রবাহ বেড়ে যায়, যার ফলে উত্থান ঘটে। এই চেইনের যেকোনো একটি পর্যায়ে সমস্যা হলেই ইরেকটাইল ডিসফাংশন দেখা দিতে পারে।
কী কী কারণে ইরেকটাইল ডিসফাংশন হতে পারে?
মানসিক ও শারীরিক — দুই ধরনের কারণেই এই সমস্যা হতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪৮% ক্ষেত্রে মূল কারণ ভাসকুলার, অর্থাৎ পুরুষাঙ্গে রক্ত প্রবাহ বা নার্ভ সাপ্লাই কমে যাওয়া। অন্যান্য সাধারণ কারণ:
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
প্রথম কাজ হলো সঠিক কারণ খুঁজে বের করা। এর জন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সাধারণত যা করেন:
এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমেই বোঝা যায় সমস্যাটা ভাসকুলার কিনা।
কাদের মধ্যে ভাসকুলার কারণে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়?
সাধারণত ৪০-৬৫ বছর বয়সী পুরুষ, যাদের আছে:
এই রোগ গুলোর জন্য দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গের রক্তনালীতে চর্বি জমে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়, যাকে ভাসকুলার ইরেকটাইল ডিসফাংশন বলা হয়।
ভাসকুলার কারণে সমস্যা হলে সমাধান কী?
সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর নিচের সমন্বিত পদ্ধতিতে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব:
ACRTBD-তে আমরা ভাসকুলার ইরেকটাইল ডিসফাংশন ও প্রিম্যাচিউর ইজাকুলেশনের জন্য মূলত দুটি থেরাপি দিই, একসাথে বা প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদাভাবে।
১. পি-শট (P-Shot) / প্লাজমা থেরাপি
পি-শট বা প্লেটলেট রিচ প্লাজমা (PRP) থেরাপি একটি মিনিমাল ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতি। গ্রিক দেবতার নাম অনুসারে এর নামকরণ, যাকে বলা হয় “God of Regenerative Power”।
পদ্ধতিটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
২. ফোকাসড শকওয়েব থেরাপি
লো-ইনটেনসিটি ফোকাসড শকওয়েব থেরাপিতে একটি বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে পুরুষাঙ্গের বাইরে থেকে যান্ত্রিক (বৈদ্যুতিক নয়) তরঙ্গ প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে শরীরের নিজস্ব দুটি প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়:
এর ফলে নতুন টিস্যু তৈরি হয়ে পুনরায় উত্থান ক্ষমতা ফিরে আসে এবং প্রিম্যাচিউর ইজাকুলেশনের সমস্যাও কমে।
বিশ্বব্যাপী গবেষণার ৯৫-৯৮% ফোকাসড শকওয়েব থেরাপি নিয়ে, এবং এটি ইউরোপিয়ান এসোসিয়েশন অফ ইউরোলজি দ্বারা স্বীকৃত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — সঠিক মাত্রা ব্যবহার করা, অর্থাৎ লো-ইনটেনসিটি (০.০৭-০.২৭ মিলিজুল/স্কয়ার মিমি)।
অনেক রোগী আমাদের কাছে এসে বলেন, আগে অন্য কোথাও ৫-৬ বার শকওয়েব থেরাপি নিয়েও কোনো উপকার পাননি, বরং থেরাপির সময় প্রচুর ব্যথা পেয়েছেন। পরে দেখা যায়, ভুল মেশিন বা অতিরিক্ত মাত্রার তরঙ্গ ব্যবহার করার কারণেই এমনটা হয়েছিল। এ কারণেই চিকিৎসা শুরুর আগে নিশ্চিত হয়ে নিন:
মেশিনটি লো-ইনটেনসিটি ফোকাসড শকওয়েব মেশিন কিনা থেরাপির সময় ব্যথাহীন কিনা (সঠিক মাত্রায় ব্যথা হওয়া উচিত নয়) চিকিৎসক বা থেরাপিস্ট প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ কিনা
ভুল মেশিন বা অতিরিক্ত মাত্রার তরঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিও হতে পারে, তাই সস্তা বিকল্পের পেছনে না ছুটে সঠিক জায়গায় চিকিৎসা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্যাচেলর অফ ফিজিওথেরাপি/BPT (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। প্রশিক্ষণ ও সদস্যপদ — International Society of Medical Shockwave Treatment (ISMST), অকল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড। কনসালটেন্ট — রিজেনারেটিভ থেরাপি প্র্যাকটিশনার, ACRTBD।
© 2026 ACRT BD, All Rights Reserved